আমি বধ্যভূমির মেয়ে-কবি ড. সেলিনা রশিদ


দেশকে ভালোবেসে, বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে, বিদায় বেলা বাবা বলেছিলেন-
আমার জন্য একটি স্বাধীন দেশ নিয়ে আসবেন।
এসেছে দেশ, এসেছে স্বাধীনতা, ফিরেনি আমার বাবা!
পাইনি কবরের ঠিকানা, পাইনি বাবার অস্তিত্ব, পাইনি কোন নামের তালিকা, বেঁচে আছি তাই চির কাঙাল হয়ে
আমি বধ্য়ভূমির মেয়ে…
যাবার বেলায় বাবাকে মা কথা দিয়েছিলেন-
তিনি ফিরে না আসা অবধি আমাদের পাশে থাকবেন।
কিন্তু স্বাধীনতা বিরোধী চক্র আর নষ্ট সমাজপতিদের লোলুপ দৃষ্টির কারণে
বাবার রক্তে কেনা, এই স্বাধীন দেশে আমার মা একটি রাত ও ঘুমাতে পারেনি
তাই, এই সমাজের সমস্ত কলংক আর যন্ত্রণা আমায় মাথায় ঢেলে, তিনি দিলেন গলায় দড়ি
রেখে গেলেন পৃথিবিতে আমায় চির কাঙাল করে
আমি বধ্য়ভূমির সেই মেয়ে…
তারপর ফিরে এলাম দাদীমার কাছে,
বাবার জন্য কাঁদতে কাঁদতে তিনিও অন্ধ হলেন, দাদা করলেন বিয়ে!
অবহেলায় অযত্নে দাদীমা‘ও আকাশরে তারা হয়ে গেলেন , আমাকে রেখে গেলেন চির কাঙাল করে
আমি সেই বধ্য়ভূমির মেয়ে…
কথা দিলেন পিতামহ- আমাদের কে মাথা গুঁজার ঠাঁই করে দিবেন।
কিন্তু আপন চাচাদের চক্রান্তে আর ষড়যন্ত্রে হারিয়ে গেলাম
বাবার রক্তে কেনা এই মানচিত্রের কোন এক অন্ধকার গহব্বরে, বেঁচে রইলাম শুধু পরিচয়হীন হয়ে
আমি সেই বধ্য়ভূমির মেয়ে…
এভাবেই লাথির পর লাথি খেয়ে, বলের মতন বাঁচতে গিয়ে পড়লাম কাকীমার সংসারে।
একদিন কাকীমাকে বলেছিলাম ভয়ে ভয়ে আধো কণ্ঠে, কাকীমাগো, ওদের বাবাকে একটু একবার বাবা বলে ডাকি?
কাকীমা চোখ দুটোকে বড় করে বলেছিলেন -দূর হ! এখান থেকে, ডাইনী, তোদের মুখ দেখাটা ও পাপ!!
নিজের বাবাকে খেয়েছিস, এখন আমার স্বামীকে ও খাবি?
সেই থেকে আর বাবা ডাকা হয়নি !!
বেঁচে রইলাম অবশেষে এই মানচিত্রে অপয়া আর অপরাধী হয়ে
আমি সেই বধ্য়ভূমির মেয়ে …
অবশেষে হই বাল্য বিয়ের শিকার, এক বেকার ছেলের সাথে
কারখানার শ্রমিকের মত কলের চাকায় পিষ্ট হয়ে, সকল যন্ত্রণার উর্ধ্বে
স্বামীর সংসারের সকল ঘানি টানতে থাকি … অত:পর
একদিন তাকেও দেখি অন্য কারো সংসারে!
আবারও হই ষড়যন্ত্রের শিকার, হারাই মানসিক ভারসাম্য, হই তালাকপ্রাপ্ত !!!
বঞ্চিত হই পিতার রক্তে কেনা এই স্বাধীন দেশের সকল অধিকার থেকে,
আমরা সেই বধ্য়ভূমির মেয়ে…
যাদের রক্তে এই মানচিত্র, এই লাল সবুজের পতাকা, নইে তাদরে তালিকা, নেই তাদের অস্তিত্ব,
দেশের স্বাধীনতার জন্য শহীদ হয়েও, এই ৫৬ হাজার বর্গমাইল যুক্ত মানচিত্রে
মাত্র সাড়ে তিন হাত মাটির ঠিকানা পাবার নেই যাদের অধিকার
আমরা তাদরে মেয়ে, আমরা সেই বধ্যভ‚মির মেয়ে..

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *