নারীর মুক্তিই, বিশ্ব মুক্তি

নারী মুক্তি ভিন্ন মানবসমাজের উন্নয়ন সম্ভব না। নারী-পুরুষ মিলেই এই সমাজব্যবস্থা। তাই মিলিত দায়িত্ব নিয়েই রাষ্ট্র-সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন ও উন্নয়ন সম্ভব। সম্ভব মুক্তির প্রকৃত পথ আবিষ্কার করা। মানব জগৎ নারী-পুরুষ উভয়কে নিয়েই। অথচ নারীদের অধিকারের স্বীকৃতির জন্য অতীতে আন্দোলন করতে হয়েছে। আজও করতে হয়।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে প্রাসঙ্গিকভাবে নারীদের নিয়ে ভাবলে মনে আসে, ইতিহাসের কোন সন্ধিক্ষণে শুরু হয়েছিল নারী-মুক্তি আন্দোলন? যে মুহূর্ত থেকে নারী-পুরুষের বৈষম্য নিয়ে নারীরা চিন্তা করতে শুরু করেছিল, তখন থেকেই শুরু হয়েছিল মুক্তির চিন্তা। যখন অপশন আসে উচ্চতর শিক্ষাটা কে নেবে? তখন ছেলেকে নিয়েই ভাবা হয়। হয়তো সেটা অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে আজকের সমাজে। সেটা কিন্তু পুরোটাই নয়। একই কাজ ছেলেদের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছামূলক আর মেয়েদের ক্ষেত্রে যখন বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে, তখনই মেয়েদের মন বিদ্রোহী হয়ে উঠে। অবস্থার পরিবর্তনের জন্য লড়াই করে।

নারীমুক্তি আন্দোলনেও দুটি ধারা। একটি হচ্ছে বুর্জোয়া ফেমিনিজম, আরেকটি বিশ্বে পুঁজিবাদের উত্থান। শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে যে আন্দোলনের বীজ বপন করেছিল, তার মধ্যে দিয়েই গড়ে উঠেছিল অসংখ্য সাধারণ নারী যারা কল-কারখানায়, খেতে-খামারে কাজ করে। যারা নিম্নবিত্তের প্রান্তিক মানবী, যারা আজও পায়নি জীবনধারণের ন্যূনতম সুযোগ। নানা পারিবারিক-সামাজিক নির্যাতনের শিকার নারীদের সংঘবদ্ধ করার আন্দোলন, তাদের দুর্বিষহ জীবনের গ্লানি থেকে মুক্তির আন্দোলন এখনো চলছে।

বর্তমানেও নারীর অবস্থান সর্বত্র এক নয়। শ্রেণিবৈষম্য নারীর আর্থসামাজিক অবস্থা চিহ্নিত করে। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে যাঁরা উঁচুতে বিশেষ করে মহানগর, নগরে আছেন তাঁরা কিছু সুবিধা পান। যেমন-রান্নার আধুনিক উপকরণ, পানির সুব্যবস্থা, সর্বক্ষণের কাজের লোক, আবার শহর নগরে যারা বস্তি অঞ্চলে থাকে, তাদের জীবনসংগ্রাম কিন্তু ভিন্ন। তেমনি গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র নারীদের জীবনসংগ্রাম নতুন এক বোধের জন্ম দেয়। আমাদের দেশের নারীরা পরিবারের জন্য প্রতিদিন চৌদ্দ থেকে পনেরো ঘণ্টা শ্রম দেয়। ভাত রাঁধা, জ্বালানি কাঠ জোগাড় করা, পানীয় জলের ব্যবস্থা করতেই সাত ঘণ্টা খরচ হয়ে যায়।

আমাদের দেশে আজও বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয় ‘নারীর পূর্ণতা মাতৃত্বে’। এ দাবি পূরণ করতে গিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পূর্ণ শ্রমিক থেকে ক্রমশ আংশিক শ্রমিকে পরিণত হচ্ছে মেয়েরা। আমাদের দেশে নারীশিক্ষার প্রসার, বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ রোধ ইত্যাদি বিষয়ে উনিশ শতক থেকে সমাজের প্রগতিশীল অংশ কাজ করে গেছেন। সে কাজ আজও চলছে।

আমাদের দেশে বেগম রোকেয়া, ফজিলতুন্নেছা প্রমুখ নারী নেত্রীরা উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। আজকের নারীমুক্তি আন্দোলনের অগ্রপথিক হিসেবে বহু নারী কাজ করে গেছেন যাঁদের নাম ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়নি। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে মেয়েদের গৌরবজনক ভূমিকা আছে। আজকে সাক্ষরতার হার বেড়েছে, নারীর ক্ষমতায়নে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। মেয়েরা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, রাজনীতি সর্বক্ষেত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে। আমাদের উনিশ শতকের মানবতাবাদের প্রথম শর্তই ছিল নারীমুক্তি। নারীর যাবতীয় সমস্যাকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করা প্রয়োজন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক্ষেত্রে ভূমিকা অপরিসীম। দলমত নির্বিশেষ সবাই একটি কথা মানতে বাধ্য হবে, আজকে বাংলাদেশের নারীদের যে অবস্থান। সেখানে শেখ হাসিনার অবদান তুলনাহীন।

মানব জীবনের মর্যাদাবোধকে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্য দিয়েই নারীমুক্তি আসবে। মানসিক দাসত্ব বড় কঠিন। এই দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙতে হবে। নারীদের নিজস্ব সদগুণরাশি ও মূল্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। জ্ঞান অর্জন, আত্মসংযম, শ্রমনিষ্ঠা, আদর্শের প্রতি নিষ্ঠা, সেবা, ক্ষমতায়ন তার সঙ্গে থাকবে দৃঢ়তা, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ। প্রতিবাদ হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অসত্যের বিরুদ্ধে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। আইন আছে, প্রচার আছে, তারপরও পণপ্রথার শিকার হয় বহু বধূ পারিবারিক হিংসার বলি হয়, কিশোরী কন্যা, বৃদ্ধা মাসহ আরও নানা সম্পর্কের পানিতে আবদ্ধ নারী। নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে মেয়েরা। একুশ শতকের পৃথিবী মেয়েদের আজও নিরাপত্তা দিতে পারেনি। মুক্ত দুনিয়া মুক্ত বাণিজ্যের জগতে মেয়েরা হয়ে যায় পণ্য। এর থেকে মুক্তি বড় জরুরি। এ মুক্তির জন্য প্রয়োজন আমাদের মানসিক পরিবর্তন। রাষ্ট্রীয় সামাজিক পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন আর বহুযুগ লালিত সংস্কার আর অভ্যাসের দাসত্ব থেকে মুক্তি। তবেই হয়তো আসবে আমাদের কাঙ্ক্ষিত মুক্তি। আমাদের মনে রাখতে হবে নারীর মুক্তিই, বিশ্ব মুক্তি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *