“একজন সেলিনা রশিদ”

জন্ম:

১৯৬৩ সালের ২৭ শে নভেম্বর গাজীপুর জেলার, শ্রীপুর থানার, মাওনা ইউনিয়নের টেপির বাড়ি গ্রামে সেলিনা রশিদ জন্মগ্রহণ করেন। অল্প বয়স্কা মা আনোয়ারা সেলিনা কে জন্ম দিলেও লালন-পালন সম্পর্কে তেমন বুঝে উঠতে পারেনি। অন্যদিকে আতুর ঘরে বাবা জহির উদ্দিনের ঢোকা নিষেধ, অবশ্যই ৪০ দিন যেতে হবে। এদিকে ছেলে সন্তান না হয়ে মেয়ে সন্তান হয়েছে বলে শিশু সেলিনার কোন যতœ নেবার প্রয়োজন কেউ মনে করেনি। অবহেলায় অযতেœ বেঁচে থাকে সেলিনা। কিছুদিন পর বাবার চাকরি হয়ে যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। তাই শিশু সেলিনা কে ও রেখে বাবা পশ্চিম পাকিস্তান চলে যায়। মা আনোয়ারা শ^শুর বাড়ির নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বাবার বাড়ি চলে আসেন। এখানেও নির্যাতন, কারণ মা আনোয়ারার ঘরে ছিল সৎ মা। অনেক কষ্টে তাদের দিন পার হতে থাকে।

শৈশব:

শিশু সেলিনা ও তার মা নানার বাড়িতে সৎ নানীর নির্যাতনের শিকারে বড় হতে থাকেন। হঠাৎ একদিন বাবা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে চলে আসেন এবং সেলিনা ও তার মা’কে পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে যান। সেখানে ২/৩ বছর ভালই কেটে যায়। বয়স যখন ৬, তখন পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তান এই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। আকাশে অশনি সংকেত, যুদ্ধের আভাস, বিষয়টি আন্দাজ করতে পেরে বাবা জহির উদ্দিন সপরিবারে বাংলাদেশে নিজের ভিটায় চলে আসেন। এখানে সেলিনা এবং তার দুই বোন ও মা’কে রেখে বাবা জহির উদ্দিন যুদ্ধে চলে যান। যাবার বেলায় মা আনোয়ারা বলেছিল এই ছোট ছোট শিশুদের নিয়ে আমি কোথায় যাবো? বাবা জহির উদ্দিন বলেছিলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের ডাক এসেছে, এদেশ কে স্বাধীন করতে হবে, এদেশের মানুষের অধিকার এনে দিতে হবে। দোয়া করো যেনো গাজী হয়ে ফিরে আসতে পারি, আর যদি না পারি তবে আমার দেন মোহরানাটা ক্ষমা করে দিও।
যাবার বেলায় শিশু সেলিনা বলেছিল- বাবা আমার জন্য কি নিয়ে আসবেন, বাবা বলেছিলেন- একটি স্বাধীন দেশ নিয়ে আসবো আর তোমার জন্য স্বাধীনতা। বাবা চলে গেলেন মুক্তিযুদ্ধে।

কৈশোর:

সেলিনার বয়স আট, বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হলেন, দেশ স্বাধীন হলো। মা বিধাবা আনোয়ারা বেগম অন্তসত্তা আর তিন বোন নিয়ে দূর্বিসহ জীবন যাপন। শুরু হলো দাদার বাড়িতে বিভিষীকাময় অত্যাচার আর নির্যাতন। সব সহ্য করেও স্বামীর ভিটা মা আনোয়ারা ছাড়বেন না। আর সেদিন থেকে শুরু হলো ষড়যন্ত্র, মা আনোয়ারাকে কলংকের কালিমায় ঢেকে বাড়ি থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করা হবে। কারণ সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র।
একদিন অন্তসত্তা মা আর ছোট ২ বোন কে নিয়ে ৯ বৎসরের সেলিনা দাদার বাড়ি হতে খালি হাতে এক ঘন সন্ধ্যায় অজানার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। পথিমধ্যে জনশূন্য পাথার, মাঝ খানে চিকন একটি খাল, বুক পানির সেই খালে মা আনোয়ারা পড়লেন মহা বিপদে। তাই খালের পাড়ে বিন্নিছোবার নিচে বসে ভাবছে মা আনোয়ারা কি করে সবাই কে নিয়ে ঐ পাড়ে যাবে। হঠাৎ কয়েকজন লোকের আনাগোনা, মা বুঝতে পারলেন ডাকাত দল হবে। তাই সে বিন্নিছোবার নিচে চুপ করে বসে রইলেন। সেলিনা এক বোনের মুখে আঙ্গুল চেপে ধরলেন আর মা ধরলেন আরেক বোনের মুখে। যাতে ওরা কোনো শব্দ করতে না পারে। এদিকে ডাকাত দল পাড় হওয়ার সময় মাথা থেকে একটি ছালার বস্তা পানিতে ফেলে দিল, জো¯œা রাতে সেই পানি রক্তে রঞ্জিত হয়ে উঠলো, তাই দেখে মা ভয়ে কাঁপছে এদিকে সেলিনা ভাবছে যদি ডাকাত দল টের পেয়ে যায় তবে তো আর রক্ষা নেই। ডাকাত দল চলে গেল, এবার সেলিনা ও তার মা মুখে চাপা হাত উঠিয়ে নিয়ে দেখল- কোলের শিশুটি মরার মত অবস্থা হয়ে গেছে। দম বন্ধ হয়ে গেছে মা’র। সে কথা আন্দাজ ছিল না, কারন মা ভাবছে একটু শব্দ পেয়ে ডাকাত দল ২৩ বৎসরের বিধবা আনোয়ারা কে তুলে নিয়ে গেলে বাচ্চাদের কি হবে? মা’র কলিজায় পানি নাই, এদিকে কোলের শিশুটিকে বোধ করি আর বাঁচানো গেল না। তবুও খাল হতে পানি এনে অনেক চেষ্টা করেও শিশুটির জ্ঞান ফিরল না। অবশেষে সেই অজ্ঞান শিশুটিকে নিয়েই মা আনোয়ারা খালের ঐপাড়ে রেখে এলো তারপর আবার আর একটি মেয়েকে নিল, এভাবে তিন বারে তিন জনকে পাড় করলো। মা আনোয়ারার সেদিনের সেই ভয়াবহ কথা মনে পড়লে সেলিনার বুক আজও কেঁপে ওঠে। পাথার পাড় হল, তখন রাত প্রায় ১০টার মত বাজে। মা বাড়িতে উঠলো আর বলা হলো না এই মরা বাচ্চার কথা। এভাবেই রাত কাটলো সেলিনাদের। মা সারা রাত তাহাজ্জতের নামাজ পড়তে পড়তে সেলিনা দেখলো তার ছোট্ট বোনটি মিট মিট করে তাকাচ্ছে। মাকে ডাকলো তার পর সে কি কান্না, মা’র বুকটা মনে হল ভরে গেলো। সে কথা ভাবলে সেলিনা আজও নির্বাক হয়ে যায়। সকাল হলো তার পর ঐ বাড়ির লোকেরা খিচুরি খেতে দিল। তাই খেয়ে আনোয়ারা বাপের বাড়ি এলো। বাড়ি তো নয় বিশাল এক জঙ্গল। আনোয়ারার বাবা যুদ্ধে শহীদ হবার পর এ বাড়ি ছেড়ে আনোয়ারার সৎ মা ও তার ছোট এক ভাই পাড়ি জমিয়েছে পঞ্চগড়ে। সেখানে সেলিনার নানার আরেক বাড়ি ছিল। পুরাতন, জীর্ণ, শীর্ণ পরিত্যক্ত বনে জঙ্গলে ঘেরা এই বাড়িতে কিন্তু থাকার অযোগ্য তাই আশে পাশে বাড়িতে আশ্রয় চাইলো যাতে এই জঙ্গল পরিষ্কার করে উঠতে যে কয়দিন লাগে, কিন্তু অল্প বয়সেই বাবা আর স্বামীকে খেয়েছে, বাবা আর স্বামী কবরের মাটি পর্যন্ত পায়নি। জানাজা পায়নি, তাছাড়া ৩/৪ জন অসহায়কে কেবা জায়গা দিবে? স্বামীর বাড়ি হতে বিতারিত, নিশ্চয় কোন কলংক করে এসেছে, এইসব দাগ নিয়ে সবাই দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল। অবশেষে বাড়ির আশে-পাশে কাঁঠাল তলায় বাচ্চাদেরকে বসিয়ে রেখে মা আনোয়ারা আর সেলিনা শুরু করল বন পরিষ্কার করার সংগ্রাম। কয়েক ঘন্টা জঙ্গল কাটার পর ঘরের মুখ পাওয়া গেল। দেখা গেলো কাঠের দরজা গুলো উইপোকারা মাটি দিয়ে ঢেকে রেখেছে। বারান্দা কে গিরে রেখেছে উইপোকারদের বড় বড় ঘর। অনেক কষ্ট করে দরজা পরিস্কার করে ঘরে ঢুকলেন। মা মেয়ে দেখলো এক আজব কান্ড, ঘর ভর্তি বাঁশের চারা বেঁকা-তেরা হয়ে হয়ে আছে। শুরু হলো সেই সব পরিষ্কার করার অভিযান। কয়েকশত সাপ এদিক সেদিক ছুটা ছুটি শুরু করল, তবুও যেন তাদের ভয় নেই। কারন তাদের এছাড়া আর কোন জায়গা নেই। সাপের ছোবল অনেক ভালো তবুও আনোয়ারা কলংকের কালীমায় ঢাকা পড়তে চায় না। একজন সতী নারীর কাছে মানুষের চেয়ে মনে হয় সাপের ছোবল অনেক ভালো। দুপুর গড়িয়ে গেলো এখনো ঘরটাতে থাকার উপযোগি করতে পারলো না। কারণ কয়েক বছরের পরিত্যক্ত বাড়ি কি একদিনে পরিষ্কার হয়? অবশেষে সন্ধ্যায় আবারো সেই বাড়িতে উঠলো। সারা দিন না খাওয়া, ওই বাড়ির মহিলা ওদেরকে ভাত খেতে দিল, মহিলাকে মা আনোয়ারা চাচীমা বলে ডাকত। এমনেতেই চাচীমা মানুষ হিসেবে খুব দরদী ছিল। যদিও চাচাজান বাড়তি জামেলা নিতে চাননি। মা আনোয়ারা বলেছিলেন শুধু আজকের রাতটাই, পরে আর আসব না।
পরের দিন সকালেও সবাই গেল আবারও জঙ্গল পরিষ্কার করতে, অবশ্য চাচীমা ই একটি দা আর একটি কাঁচি দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন। পর দিন সারা দিন হাড় ভাঙা পরিশ্রম করে আর সাপের সাথে যুদ্ধ করে বাড়ি দখল করে নিলো, অবশ্যই ঘরে একখান চৌকি ছিল সেটি বেশ পরিপক্ক কাঠের ছিল তাই ইউপোকা কেটেও তেমন কিছু করতে পারেনি। মাচার নিচ হতে কয়েকখানা ডেকচি, একটি বড় সিন্দুক, সেটা ভেঙে নানুর হাতের কয়েক খানা কাঁথা, বালিশ, খুঁজে পেল কয়েক খানা মাটির কলসি। কলসির মুখ মাটি দিয়ে বন্ধ ছিল, সেগুলো খুলে কয়েক মণ বীজ ধান পাওয়া গেল। মা খুঁজতে থাকল খাবার মত কোন কিছু পাওয়া যায় নাকি। দেখলো কয়েকটি মিষ্টি কুমড়া, গাছ ভর্তি কাকরোল, মরিচ গাছে মরিচ, কলার বাগে করার মোচা, গাছে পাকা কলা, কচু গাছ, বাড়িতে শতশত বাঁদুড়, অবশ্যই জঙ্গল পরিষ্কার করা কালীন এই গাছগুলো মা কাটেনি। তখন মা পাশের বাড়ি থেকে তাল পাতায় আগুন এনে আর জল এনে কাকরোল সেদ্ধ করে সবাইকে নিয়ে খাওয়ালেন। ভোর হলো শুরু হলো যা আছে তা ই নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। দুই দিন পর মা আনোয়ারা গেলেন ঐ চাচার বাড়িতে, যাকে তিনি স্বামীর সাথে বিদেশ যাবার কালে মা’র কানের সোনা বিক্রি করে একটি সেলাই মেশিন কিনে দিয়েছিলেন। সেটি ঐ চাচার কাছে দিয়ে গিয়েছিলেন। তাই দিয়ে চাচাজান সংসার চালাত। আর সেই কারণে চাচীমা মা আনোয়ারাকে বিপদের দিনে ২ রাত থাকতে দিয়েছিলেন। মা আনোয়ারা সেই সেলাই মেশিন চাইলে চাচাজান অস্বীকার করলেন। মা আনোয়ারা কান্নাকাটি করেন, তাতে পাড়ার লোকেরা চাচাজান এর সাথে বদনাম তুলে দিয়েছিলেন। অবশেষে চাচীমা একদিন সেই মেশিন এনে মা’র হাতে তুলে দিলেন। অবশ্যই এর জন্য চাচীমাকে অনেক ক্ষতি পূরণ দিতে হয়েছে। মা আনোয়ারা শুরু করল জীবন সংগ্রাম এই সেলাই মেশিন নিয়ে। দিন-রাত সেলাই মেশিন আর চার মেয়েকে এই নিয়ে তার সংসার। এটি নিয়ে সেলিনার লেখা একটি কবিতা আছে। সেই কবিতাটিতে সেলিনা তার মা’য়ের জীবন সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছেন-

আমার শ্রেষ্ঠ মা
ছোট বেলায় বলতাম মাকে
বাবা আসবে কবে?
মা বলতো বাবা নাকি তারার ভিড়ে গেছে
বলতাম মাকে- ঐ আকাশের
কোন তারা টা আমার বাবা
মা বলতো, ঐ যে দেখ বড় করে জ¦লছে যেটা
বড় হয়ে বুঝতে পারি ,ওসব ছিল মিথ্যে কথা
তাই তো বলি তুমি আমার শ্রেষ্ঠ মা’গো
শ্রেষ্ঠ আঁচল পাতা।
রাত্রি জেগে করতো সেলাই
চোখে পড়ত কালি
নতুন জামা আমায় দিয়ে আর
মায়ের কাপড় দিতে তালি
ঘুমের ঘোরে সেলাই করে সুঁই বিঁধতো হাতে
তবু মাগো করতে সেলাই, আমি ভালো থাকি যাতে।

এভাবেই সেলিনাদের সংসার চলতে থাকলো ।

স্কুল জীবন:

বাড়ির পাশেই প্রাইমারি স্কুল সেথায় সেলিনার পড়ালেখা। সেলিনার বাবা নাই বিধায় ক্লাস রুমের প্রথম বেঞ্চে কোনো দিন বসতে পারে নাই। যদিও স্কুলে সময় মত যেত। কারণ সেলিনা এতিমই নয় শুধু, সেলিনার পিতাকে গন্ডগোলের বছর মানুষ মেরে ফেলেছে। তাছাড়া তার কাফনের কাপরের ভাগ্য এবং কবরের মাটির ভাগ্য হয়নি। তাছাড়া বিভিন্ন কারনে সেলিনারা অপায়া,অলক্ষুণে তাই ওদেরকে সামনে দিয়ে কেউ পেছনে বসাটা অমঙ্গল। স্কুলে যখন শরীর চর্চা ক্লাস হতো তখনো সেলিনা পেছনে, মাঠ পরিষ্কার করা, স্কুল ঝাড় দেয়া, স্যারদের ফরমাইশ করা এসবই ছিল সেলিনার কাজ। কখনোই থামতে শিখেনি, শুধু কাজ আর কাজ। খুব ভোরে ওঠে নামাজ পড়ে, কোরআন পড়ে, বাড়ির উঠান ঝাড় দিয়ে মাদরাসায় যাওয়া তার পরে স্কুল থেকে এসে বাড়ির সকল কাজ হাস,মুরগি, সবজি বাগানে পানি দেওয়া, ভাই বোনদের দেখাশোনা, তারপর রাত ১১টা নাগাদ লেখাপড়া। এভাবেই চলছে সেলিনার জীবন। ১৯৭৫ সাল সেলিনা এবার ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হল বাড়ি থেকে ৩/৪ কিলোমিটার দূরে। সাথে আরোও পাড়ার মেয়েরা। পথের মাঝে ঘন বন-জঙ্গল। এই নিয়ে কয়েকজন মেয়েকে ধর্ষণের ঘটনা শোনার পর সকল মেয়েরা লেখা-পড়া বন্ধ করে দিল। কিন্তু সেলিনার কি হবে? ৭ম শ্রেণীর ছাত্রী পাড়ার এক মৌলবী স্যার নাম হেদায়েতুল্লাহ, তার হাতে পায়ে ধরে মা আনোয়ারা বললেন আমার মেয়েকে যাবার পথে আপনার সাইকেলে যদি একটু নিয়ে যেতেন। মৌলবী স্যার তাই সেলিনা কে নিয়ে যান। ফেরার পথে অনেক সমস্যা, ছেলেদের সাথে জঙ্গল পাড় হয় তার পর হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যায় বাড়িতে। বাড়ি এসে হাস মুরগি ঘরে তোলা, গাছ গাছালীতে পানি দেওয়া, নামাজ পড়ে ছোট বোনদের নিয়ে পড়তে বসা।

বাসস্থান:

সেলিনারা যে ঘরে বাস করত সেটা ছিল নানার ও বাবার নয় পুরাতন পরিত্যক্ত বাড়ি, টিনের চালা ঝুর ঝুড়ে ভাঙা, বৃষ্টি পড়লেই ঘরে থাকা যেত না। ঘরের ভেতর বড় বড় কচুর ডাটা মাথায় দিয়ে সময় পাড় করতে হতো এমনও সময় গেছে বসে থাকতে হয়েছে সারা রাত। এমনি ভাবে কত দিন আর রাত শুতে পরেনি তার কথা আজও ভোলা যায় না। অন্যদিকে ঘরের ভেতর ভেজা স্যাঁত স্যাঁতে থাকার কারণে বাশেঁর চারা গুলো মাটি ফুড়ে ঘরের ভেতর আসতো ,মাচার নিচে, চৌকির নিচে ৮/১০ দিন পরপর পরিষ্কার করতে হতো কারণ বাড়িটি ছিল বাঁশ ঝাড়ে ঘেরা। তিন পাশে বাঁশ আর এক পাশে কবর খানা, মানুষ কেন জ¦ীন- পরীও ভয় পাবে এমন একটি বাড়িতে সেলিনাদের বসবাস। তাছাড়া সেই ভেজা স্যাঁত স্যাঁতে মাটির মধ্যে উইপোকার ঢিবি, ইঁদুরের বসবাস। সেই সাথে সাপের বাড়ি ঘর। অনেক সময় ভাত খেয়ে থালার নিচে সাপের পেচানো অবস্থা। মাটির ঘরের ফাটল দিয়ে সাপের বাড়িতে ব্যাঙ ধরার চিৎকার। অনেক সময় দেখা গেছে ঘরের চালায় সাপ ঝুলে আছে, দেখা যেত প্রকৃতির ডাকে বাঁশ ঝাড়ের নিচে গেলে চার দিকে সাঁপের চলাচল। ভয়ে ভয়ে বাথরুম করা, ভয়ে ভয়ে জীবন কাটানো, মা বলতো তবুও ভালো মানুষের ছোবল থেকে। সাপের ছোবলে যদি প্রাণ যায় তবে স্বর্গ পাবে। এই দু’দিনের পৃথিবীতে বেঁচে থাকলে শুধু পাপ আর পাপ। তাছাড়া যত তাড়াতাড়ি তোমাদের বাবার কাছে যাওয়া যায়। তাই সেলিনারা সাপের ছোবলের ভয় করতোনা স্বর্গে তার বাবার কাছে যাবার লোভে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতেও প্রস্তুত ছিল।

আর্থিক অবস্থা:

সেলিনার মা সেলাই কাজ করতো তাই সংসার ভালোই চলার কথা ছিল কিন্তু মানুষ এর মজুরি সহজেই দিত না । চাইতে গেলে বলতো খোদার সকালে তুমি এসেছো টাকার জন্য? বিধবা মহিলার মুখ সকালেই দেখতে হলো, তাছাড়া আরও অনেক খারাপ খারাপ কথা বলতো। মা টাকা ছাড়াই চলে আসতো, আবার অনেকে টাকার বদলে চাউল দিত। অন্যদিকে বেশি টাকা চাইলে বলত কিসের টাকা চাইতে আসছ? কোন খারাপ পথে টাকা উপার্জনের কথা অথবা ও বাড়ির মহিলা নানা কটু কথা বলে অপমান করতো। তবুও মা সেলাই কাজ করে ৩০% মানুষের কাছ থেকে টাকা পেত। আর বাকিরা টাকা না দিয়ে কলংক দিত । এভাবেই জীবন পাড় হত শহীদ পরিবারের সেলিনাদের।

খাবার:

সেলিনারা বাঁশের চারা, কলার মোঁচা, তরি-তরকারি, কচু, কাঁচা কাঁঠাল সেদ্ধ, পাকা কাঁঠাল খেয়ে কোন রকমে জীবন পাড় করতো। তারপর দু একটা মুরগী, হাঁস, পালন, ছাগল বর্গা পালন, করে সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা- কাটা করতো। খাবার যা ই ছিল কিন্তু সে সব পাক করে খাবার স্থান যেমন: পাকের ঘর কিংবা মাটির চুলায় বর্ষাকালে ঘরের চালার অভাবে তো কঠিন হয়ে পড়ত, অঝোড় বৃষ্টির মধ্যে মাটির চুলা ভিজে টুপ-টুপ অন্য দিকে লাকরী রাখার জায়গা নেই। গাছের শুকনো পাতা জমিয়ে তালগাছের পাতা দিয়ে ঢেকে রাখা হলেও তুমুল বর্ষায় না খেয়ে বসে থাকতে হতো। অনেক সময় দু পয়সা নিয়ে পাশের বাড়ির কাউকে যদি বলতো, কতদিন ধরে চাচা মাছের গন্ধ পাই না, তাই যদি হাট থেকে মাছ এনে দিতেন। আসতো হাটবার। ওনারা বলতো কি কপাল তোমার বাবা নাই, স্বামী নাই, ভাই নাই তাছাড়া কোনো ছেলে সন্তানও জন্ম দিতে পারোনি, একটু ধমকের সুর দিয়েই বলতো- দাও দাও মাছ নিয়ে আসবোনে। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত ৮টা এখনো হাট থেকে মাছ নিয়ে আসছে কিনা তাই পাশের বাড়িতে মা আনোয়ারা কয়েকবার গিয়ে অপেক্ষায় থাকতো।
এদিকে সেলিনারা অধীর আগ্রহে বসে থাকতো বহুদিন পর ওরা মাছের গন্ধ খাবে বলে। শেষ পর্যন্ত রাত ১১টায় মাছ পেলো। কিন্তু বাড়ির লোকেরা রাত ১০টায় আসলেও খবর দেয়নি, তাই মাছ পচেঁ গেছে তাছাড়া পিপিড়াঁ ধরেছে, মা কাঁদতো আর বলতো সবই আমার কপাল। আজ যদি কোন পুরুষ মানুষ থাকতো তবে তো আর মাছ গুলো পঁেচ যেত না। সেলিনা বলতো মা আমি বড় হয়ে তোমার ছেলে হবো, মা তুমি দেখে নিও। তাছাড়া মা আমরা আর মাছ খাবো না। মাছ কেটে পাক করতে রাত ১২টা । এদিকে মেয়েরা ঘুমিয়ে পড়তো। মা ১/২ টি মাছ ভেঙে তরকারী রান্না করতো আর শুধু গন্ধ নিত সেলিনারা।

ভালোবাসা:

ভালোবাসা কি তা সেলিনারা জানে না। মা’কে চিরদিন কাঁদতে দেখেছে আর বাবাতো তারার ভিড়ে চলে গেছে। নানা ও যুদ্ধে জীবন দিয়েছে। তার নানী জন্মের আগে চির বিদায়, দাদী জন্মের আগেই চলে গেছে পরপারে। দাদা আর চাচারা মিলে তো বাড়ি থেকে তাড়িয়েই দিয়েছে। তা হলে কে ভালোবাসবে? জীবনে শুধু অবজ্ঞা, অত্যাচার, অবিচার, অবহেলা ছাড়া পৃথিবিতে আর কেউ নেই। এই সমাজে কলংকিত পরিবার নামে সেলিনারা আখ্যায়িত, কারো বাড়িতে বা দোয়ারে দাঁড়াতে পারতো না। স্কুলে যাবার পথেও সে একা একা পথে হাঁটতো। সবাই তাকে ভিবিন্ন ভাবে আঘাত দিয়ে টিট্কারী মূলক কথা বলতো। নিজেকে বড় অপরাধী মনে করতো, পৃথিবিতে তারা কখনো হেসেছে কিনা মনে নেই আজও। স্কুলে যাবার পথে দুষ্ট ছেলে মেয়েরা তাকে খোঁচা মেরে, পায়ে পারা দিয়ে ফেলে দিয়ে, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে মজা পেত। তাই নিয়ে কান্না করতে করতে বাড়ি আসলে মা ও তাকে ধরে থাপ্পর লাগিয়ে দিত। তাই সেলিনাদের কাঁদার ও কোন অধিকার ছিল না। চোখে জল নিয়েই চুপ করে থাকতো, মা’র কাছেও বলতো না কারণ মা থাপ্পর দিত ঠিকই পরক্ষণে মা কাদঁতে কাঁদতে মরন কেন হলো না , পাগল কেন হলো না , বলে কান্না- কাটি করতো । তাই সেলিনা মা’র কাছেও বলতো না। স্কুলের স্যারেরা তাকে দিয়ে ঝাড় দেওয়া, মাঠ পরিষ্কার করা, খাবার পানি আনা এসব করাতো। মা বলতো, কেউ যদি মারে তবে তুমি দুঃখ করবেনা, বলবে আল্লাহ আমাকে ধৈর্য দাও, কারণ ক্ষণস্থায়ী মানুষ তোমাকে কিছু দিতে পারবে না। মনে রাখবে তোমাকে অনেক বড় হতে হবে, লেখা পড়া করতে হবে। কাজ করতে হবে। আর সাধনা থাকতে হবে। মহা ধৈর্য ধারণ করতে হবে। মনে রাখবে, মানুষ সাপের চাইতেও ভয়ংকর। তাই সেলিনারা সকল কষ্ট মাথা পেতে নিয়ে কষ্টকেই বুঝি ভালোবেসেছিল।

১৯৭১ সালে রণাঙ্গনে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার কন্যা কবি ড. সেলিনা রশিদ তার পারিবারিক ও সামাজিক অসহায়ত্ব, অত্যাচার ও অবিচারের চিত্র নিয়ে তাাঁর আঁকা ছবি:

আবদ্ধ শ্যাওলা জলে শহীদ সন্তানেরা শ^াস রুদ্ধ অবস্থায় মহা সাগরে ডুবন্ত।

শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীর মাথার উপর সামাজিক নর পিচাশদের লোলুপ দৃষ্টি, এবং ধর্মীয় গোরামীর ভয়ংকর চাপে গ্রথিত তার অবস্থান তবুও শহীদের রক্তের উত্তরাধীকারদের নিয়ে ভাসমান অবস্থায় জীবন চলছে।

শহীদ সন্তানদের কলিজ¦য় সারা জীবন রক্ত ঝরবে

৭১রের স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার কন্যা সমাজে নিষ্পেশিত অবস্থায় জলন্ত অগ্নিতে দগ্ধ হয়ে ও বেঁেচ আছে।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কন্যার যন্ত্রনা

শহীদের স্ত্রীর অবস্থান, মুখে সমাজ পতিদের থাবা, বুকে যন্ত্রনার আগুন, মাথায় নরপিচাশ দের ছোবল দৃষ্টি, চোখে ধর্মীয় তীঁর ও নদী।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা স্বর্গে থেকেও কাঁদছে কারন তাদের পরিবাররা অনেক কষ্টে জীবন ধারন করছে।

শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী ও সন্তানদের জীবন যেমন মাৎস্যনায়।

উক্ত চিত্রে শহীদ সন্তানরা শত কষ্টে শত পায়ে জীবন র্নিবাহ করে বেঁেচ ছিল।

রাজাকারের কন্যারা যেভাবে আনন্দে প্রজাপতি হয়ে মুক্ত আকাশে বেড়ায় অথচ শহীদ কন্যারা আজ কোথায়।

শহীদ পরিবারের জীবন, মৃত কালো বৃক্ষের মতন।

নারীর অর্ধেক জীবন